রামকিঙ্করের তৈরি একটা শিল্পকর্ম আমি নষ্ট করেছি

রবীন্দ্রভবনের সেই সন্ধেয় তাঁর একক ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ কোনও দর্শকের পক্ষেই ভোলা সম্ভব নয়, এ জীবনে। বনদেবী থেকে দস্যু থেকে বাল্মীকি হয়ে সরস্বতীতে এসে থামলেন রবীন্দ্রগানের সরস্বতী। একা সুচিত্রা অনেক হয়ে ছড়িয়ে পড়লেন শ্রোতাদের, দর্শকদের হৃদয়ে।[...]

গত রবিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০১১, আজকাল পত্রিকার রবিবাসরে প্রকাশিত হয়েছে এই লেখা। সুচিত্রা মিত্রের আত্মজীবনী ‘মনে রেখো’-র অনুলেখক ও আজকালের সাংবাদিক অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তিনটি ভাগে তিনটি প্রসঙ্গে সুচিত্রা মিত্রের জীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন।

সম্রাজ্ঞী ও এক অর্বাচীন

মোটামুটি, দূর-দূর করে, হ্যাঁ, তাড়িয়ে দিয়েছিলেন সুচিত্রা মিত্র। আমাকে। যে কিনা সুচিত্রা মিত্রর আত্মকথা লেখার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁর দুয়ারে হাজির।

সাংবাদিকের পেশায় থাকার সুবাদে যে-কয়টা ‘প্রাইজ অ্যাসাইনমেন্ট’ জীবনে পেয়েছি, তার সেরার তালিকায় সুচিত্রা মিত্রর আত্মকথা ‘মনে রেখো’ অনুলিখন করার কাজ। সম্পাদক মশাইয়ের নির্দেশে সটান হাজির সুচিত্রা মিত্রর দোরগোড়ায়। অশোকদা একটা মুখবন্ধ খামে থাকা চিঠি দিয়েছিলেন হাতে, সুচিত্রা মিত্রকে দেওয়র জন্য। চিঠিটা অমিতাভ চৌধুরির লেখা। দরজা খুলে এবং আমাকে ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে উনি চিঠিটা পড়লেন। আমি কম্পমান হৃদয়ে, তবুও, ওঁর অসম্ভব রূপ এবং ব্যক্তিত্বের বর্ণচ্ছটার দিকে তাকিয়ে। চিঠি পড়া শেষ করে উনি স্পষ্টভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আরও স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, কী ভেবেছেন বলুন তো আপনারা? আমি গান গাইব, না আপনাদের সঙ্গে বকবক করব? বকবক করাটা আমার কাজ নয়। আর ঘটা করে আত্মজীবনী লেখার কোনও বাসনাও আমার নেই। আমাকে রেহাই দিন।

আমি তখন সত্যিই কম্পমান। সম্পাদকের প্রাইজ অ্যাসাইনমেন্ট। এমন নিদারুণ ব্যর্থতার কথা বলাও পাপ। দাঁড়িয়েই আছি। আমি দরজায় বাইরে। উনি দরজার ভেতরে।

এবার ওঁর কণ্ঠ – আমার কথা আপনি শুনতে পেলেন না?
আমি এই প্রথম একটা কথা বলার সুযোগ পেলাম যেন।
– আমাকে আপনি বলবেন না।
– কেন? অপরিচিত মানুষকে তো আপনিই বলতে হয়।
– মানে, আপনি কত বড়। আমি অনেক ছোট।
– ছোট-বড়র কথা হচ্ছে না। আপনি আমার কথা শুনতে পেয়েছেন? বুঝতে পেরেছেন? আপনি এবার আসুন। আমার অনেক কাজ আছে।

প্রচণ্ডভাবে ভেঙ্গে পড়তে পড়তে বলি, আপনি দরজা বন্ধ করুন, আমি ঠিক চলে যাব।
– আমি কারও মুখের ওপর দরজা বন্ধ করি না। আপনি আসুন। তারপর আমি দরজা বন্ধ করব।

আমি খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচার মতো বলি, পরে একদিন আসব?
আপনি বোধহয় আমার কথাটা বুঝতে পারেননি। আত্মজীবনী বলার বা লেখার ইচ্ছে বা অবসর, কোনোটাই আমার নেই।
‘সম্পাদকের কাছে আমার মাথাটা কাটা যাবে’ – বলেই ফেলি ভেতরের কথাটা।
– আপনার মাথা বাঁচানোটাও আমার কাজ?
– একদিন যদি একটু সময় দেন। আধ ঘণ্টা।

আধ ঘণ্টায় আত্মজীবনী লেখার কথা সম্ভবত উনি আগে কখনো শোনেননি। আমি ওইটুকু সময়ের কমও চাইতে পারলাম না, বেশি তো নয়ই।
– আধ ঘণ্টা? আধ ঘণ্টা কী করবেন?
– একটু কথা বলতাম আপনার সঙ্গে। এমনি।
– এমনি-এমনি কথা? আমার কিন্তু এখন সত্যিই কাজ আছে।
বুঝলাম, এমন কঠিন দরজা পেরোনো খুব কঠিন। স্বগতোক্তি করলাম, ‘ঠিক আছে, যাচ্ছি। পরে একদিন আসব।’
লাভ নেই বুঝে জিজ্ঞাসা করিনি। আপন মনেই বলেছি। জিজ্ঞেস করলাম এবার, ‘একটা প্রণাম করি?’
– কেন, রাজি হইনি বলে?
এ তো দেখছি কথা বলাও পাপ। না বলাও পাপ।
আপনার গানে অনুপ্রেরণা পাই। সে জন্য।
আমার গান তো নয়, রবীন্দ্রনাথের গান।
কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল খুবই। কিন্তু কী কথার কী যে বিচার হবে, কে জানে?

চলে এসেছিলাম। ১৬ বছর আগের ঘটনা। তার পর আরও চারবার হানাই দিয়েছি প্রায় ওঁর দরজায়। মোটে পাঁচবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর একদিন সেই ‘আধ ঘণ্টা’ সময়ের প্রার্থনা মঞ্জুর হল। সঙ্গে টেপ রেকর্ডার। আর ব্যাগভর্তি তাঁর পুরনো মুদ্রিত বেশ কিছু লেখা। সম্পর্কিত কিছু বই। ‘ইমপ্রেস’ করার যাবতীয় চেষ্টা। জানতে চাইলাম ওঁর শান্তিনিকেতন যাওয়ার ইচ্ছের কথা। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর কুড়ি দিন পরে তাঁর শান্তিনিকেতনে পৌঁছনোর কথা জানলাম। শুনলাম, আর কুড়ি দিন আগেরবাইশে শ্রাবণ কলেজ স্ট্রিটের এক দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাঁর প্রথম রবীন্দ্র-দর্শনের কথা। শেষযাত্রায় চলেছেন শায়িত রবীন্দ্রনাথ। আর দোতলা থেকে তাঁকে দেখছেন পরবর্তী কালের রবীন্দ্রগানের সম্রাজ্ঞী সুচিত্রা মিত্র। তখন ‘মুখোপাধ্যায়’। লেখক সৌরীন্দ্রমোহনের কন্যা।

তাঁর শান্তিনিকেতন-যাত্রার অংশটি ‘জন্মের দ্বিতীয় শুভক্ষণ’ নাম দিয়ে পরের দিনই দেখালাম। তখনও আমি ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ হইনি। লেখাটা পড়লেন। ওরই কথা, ওরই ভাবনা, প্রায় ওরই ভাষা। সাজিয়ে-গুছিয়ে আমি অনুলিখন করেছি মাত্র। পড়তে পড়তে রবীন্দ্রসঙ্গীত-সম্রাজ্ঞীর চোখ-ভর্তি জল। সেই জল মুছতে মুছতে তাঁর ফর্সা গাল, নাকের ডগা লাল হয়ে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে উনি বললেন, ‘তুমি খুব বদমাশ লড়কা। খুব বষ্ট দিলে আমায়।’

এই প্রথম ‘তুমি’ হলাম আমি। রবীন্দ্রসঙ্গীত-সম্রাজ্ঞীর সিংহ-দরজা দেখি এই অর্বাচীনের জন্য হাট করে খোলা।

ঘরে, বাইরে

১৬ বছর আগের কথা। তখন তাঁর সত্তর বছর। কিন্তু হাঁটায়, চলায়, কথাবার্তায় যৌবনের দীপ্তি। যত বয়স হয়েছে, মাথায় শুভ্র চুল উড়িয়ে ততই যেন সুন্দর হয়ে উঠেছেন। বলেছিলেন, আমি ‘গ্রেসফুলি’ বুড়ো হয়েছি।

কিন্তু তাঁর মনটার কোনও বুড়োত্ব ছিল না। চৌকাঠের বাইরে বেরোলে তাঁকে ঘিরে যেন ব্যক্তিত্ব ছাপিয়েও অতিরিক্ত একটা কাঠিন্য ছুঁয়ে থাকত। মানুষজন সেই কঠিনকে টপকানোর সাহস পেত না। কিন্তু তাঁর ভেতর-ঘরের চৌকাঠ টপকে ঢুকে পড়লে দেখা যেত, এক আবেগপ্রবণ বালিকা যেন সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বুদ্ধির দীপ্তি, মনন – সব কিছু নিয়েই হৃদয়-চালিত এক মেয়ে বলে বারবার মনে হয়েছে তাঁকে। এই মেয়ে কুটনো কোটে, রান্না করে, পুতুলও গড়ে।

‘কৃষ্ণকলি’ তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। জিজ্ঞেস করেছিলাম, এ গান তো পুরুষের গান। আপনি শুধু এ গান করেনই না এই গান তো শ্রোতাদের কাছে আপনার সবচেয়ে জনপ্রিয় গানও হয়ে উঠেছে।

বলেছিলেন, আমি শুধু নারী, এ কথা তোমাকে কে বলেছে? কোনও মানুষই শুধু নারী নয়, শুধু পুরুষ নয়। দুটো সত্তাই থাকে ভেতরে।‘কৃষ্ণকলি’ আমার পুরুষসত্তা গায়।

তাঁর আত্মকথা ‘মনে রেখো’ প্রথমে আজকাল শারদ সংখ্যায় ‌‌‌’৯৪ সালে, পরে বই হিসেবে প্রকাশিত হল ’৯৫-এর বইমেলায়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল জনপ্রিয়। তাঁর প্রচুর প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে পুজো সংখ্যার জন্যে আত্মকথা লেখারর সম্মতি যখন মিলল, তার পর সময় ছিল খুব কম। উনি ক’দিন পরেই যাবেন আমেরিকার বাল্টিমোরে ছেলের কাছে। ফলে বাড়িতে, রবিতীর্থের গানের ক্লাসে, ওঁর অনুষ্ঠানে যেতে যেতে গাড়িতে বসে কথা বলেছি দিনে, রাতে। লিখতে লিখতে ওঁকে দেখিয়ে নিয়েছি। এভাবেই কিস্তিতে কিস্তিতে কম্পোজ হয়েছে।

লেখা শেষ হয়নি, কিন্তু আজকাল-এ বিজ্ঞাপন বেরোবে শারদ সংখ্যায়। কী নাম হবে তাঁর আত্মকথার? বললেন তোমরা ঠিক কর। একটুও খাটবে না, সেটা কী করে হয়!

অশোকদা নাম ঠিক করলেন – ‘মনে রেখো’। ওঁকে জানালাম। বললেন, কেউ মনে রাখবে না। রবীন্দ্রনাথকে বাঙালি কখনও ভুলতে পারবে না। আমাকে খামোকা কেন মনে রাখবে লোকে? আমি কেউ না।
– এটা বড্ড বেশি বিনয় হচ্ছে। সুচিত্রা মিত্রকে এটা একদম মানায় না।
– আমাকে কি মানায়, না মানায় সেটাও তুমি বলে দেবে?
কথা বলাও বিপদ। বললাম, ঠিক আছে, কেউ না মনে রাখুক, আমার তো রাখব।
– ব্যস, সে জন্য ঘটা করে নাম দেব ‘মনে রেখো’। বড্ড জ্বালাচ্ছ কিন্তু।

এই ‘জ্বালাচ্ছ’ শব্দটা সম্বল করে ‘মনে রেখো’ নামটাই সাব্যস্ত হল। এবং এই নামটা যে কতটা যথার্থ, আমরা আজও টের পাই। ক’দিন আগে তাঁর চলে যাওয়ার পরে আরও বেশি করে উপলব্ধি করছি আমরা।

গত ১৬ বছর ধরে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখতে দেখতে , তিনি একজন পূর্ণ মানুষ – বুদ্ধির দীপ্তিতে, অনুভবের গভীরতায়। সিংহ দরজা ছিল তার হৃদয়ে। কিন্তু তাঁর দশতলার ফ্ল্যাটটা ছিল তার মাপের তুলনায় খুবই ছোট। ঘর-ভর্তি, প্যাসেজ-ভর্তি বই আর বই। ছোট ঘর নিয়ে কোন খেদ ছিল না তাঁর। খুব প্রিয় ছিল তাঁর দশতলার ফ্ল্যাটের বারান্দা। বলতেন, এখানে দাঁড়ালে আকাশটা খুব কাছে মনে হয়।

পড়াশোনা, লেখালেখি ছিল তাঁর আর-এক প্যাশন। তিনি বারবার বলতেন, গানের ছবি যদি আঁকতে না পারি, গানটা ঠিকমতো গাওয়া যায় না। এর পাশাপাশি বলতেন, রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গেলে রবীন্দ্রনাথকে পড়া দরকার। নিজের মতো করে বোঝা দরকার। তার পরই তো গানটা হয়ে উঠবে নিজের গান। যেমন মোহরের গান, জর্জের গান।

‘ক্ষীরের পুতুল’ পুরোটাই ছন্দে রূপান্তরিত করেছিলেন। বারবার বলতাম, এটা এবার মঞ্চে আনুন। বলতেন, দাঁড়াও, আগে মনের ভেতরে পুরো ছবিটা ফোটাই।

‘বাল্মীকি প্রতিভা’ এককভাবে মঞ্চে গাইতেন। একবার চন্দননগরে রবীন্দ্রভবনে যাবেন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ গাইতে। আমি সঙ্গে যাব। বাড়ি গিয়ে দেখি জ্বর। ভাল করে দাঁড়াতে পারছেন না। ওষুধ খেলেন। জিজ্ঞেস করলাম, যেতে পারবেন?
বললেন, যেতে হবেই। কত মানুষ অপেক্ষা করবেন রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রাতভা’ শোনার জন্যে।

একবারও বললেন না তাঁর গান শোনার জন্যই অপেক্ষায় থাকবেন মানুষজন। এবং কী আশ্চর্য, ‘স্বস্তিক’-এর দশতলার ফ্ল্যাটের দরজা থেকে যখন বেরোলেন, তখন তাঁকে দেখে কে বলবে একটু আগেই তাঁর দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছিল।

বাইরের মানুষের সহানুভূতি একদম অপছন্দ ছিল তাঁর। কখনও বাইরের কাউকে টের পেতে দেননি তাঁর অসুস্থতার কথা। চন্দননগরে গেলেন। রবীন্দ্রভবনের সেই সন্ধেয় তাঁর একক ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ কোনও দর্শকের পক্ষেই ভোলা সম্ভব নয়, এ জীবনে। বনদেবী থেকে দস্যু থেকে বাল্মীকি হয়ে সরস্বতীতে এসে থামলেন রবীন্দ্রগানের সরস্বতী। একা সুচিত্রা অনেক হয়ে ছড়িয়ে পড়লেন শ্রোতাদের, দর্শকদের হৃদয়ে।

আর কি কখনও, কবে, এমন সন্ধে হবে!

সেই মেয়ে

তিনি ছিলেন একা এবং সর্বজনীন। বহু বছর একাই থাকতেন এই দশতলার ফ্ল্যাটে। ছেলে কুণাল বিদেশে। ভাইঝি চিকু ২১ দিন বয়সে মাতৃহারা। তখন থেকে চিকুই তাঁর মেয়ে। পরবর্তী কালে চিকুও বিদেশে। তাঁর কাছে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের ছিল অবাধ যাতায়াত।

ছাত্রছাত্রীদের শুধু ছেলেমেয়ে বলতেন না, সত্যিই করেই ভাবতেন। কখনও বলতেন না, একা লাগে। কিন্তু কখনও-সখনও, গভীর কোনো মুহূর্তে, বিষন্ন কোনো সন্ধেয় মনে হয়েছে, অন্তর্লীন একাকীত্ব ছুঁয়ে আছে তাঁকে। কিন্তু তিনি তো সর্বজনীন। তাঁকে একা হতে নেই। নিজের একাকীত্বকে সরিয়ে রেখে কত ছাত্রছাত্রীর একাকীত্ব দূর করেছেন তিনি, তাঁর কথায়, পরামর্শে, জীবন-সম্পৃক্ত চিন্তায় এবং তাঁর গানে।

কারও বিরুদ্ধে তাঁর কোনও অভিযোগ ছিল না। ধ্রুব মিত্রের সঙ্গে দাম্পত্য মাত্র সাত বছরের। বিয়ে ১৯৪৮ সালে, বিচ্ছেদ ’৫৫ সালে। ব্যক্তিত্বের সংঘাতই বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ। কিন্তু ধ্রুব মিত্রের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করেননি কখনও। পরবর্তীকালে ধ্রুববাবু বিয়ে করেন। সেই স্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। এবং নিজের প্রাণের প্রতিষ্ঠান ‘রবিতীর্থ’-র সঙ্গেও পরবর্তী কালে যুক্ত করেন ধ্রুব মিত্রকে।

শুধু একবার খুব ভেঙ্গে পড়তে দেখেছি তাঁকে, তাঁদের দাম্পত্য-প্রসঙ্গে। রামকিঙ্কর বেইজ তাঁর মুখের মূর্তি গড়েছিলেন। রামকিঙ্কর বলেছিলেন, তোমার মুখটা বড় মজার। যখন ‘মনে রেখো’-র অনুলিখনের কাজ চলছে, তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম – মূর্তিটা কোথায়? কিছুটা এড়িয়ে গিয়ে বলেছিলেন, কী জানি।

তখন আর জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি। বহু বছর পরে, একদিন তাঁর বাড়িতে কথায় কথায় উঠল রামকিঙ্করের প্রসঙ্গ। জিজ্ঞেস করলাম, আপনার সেই মূর্তিটা কোথায়?

গল্প থেমে গেল। উনি চুপ করে চেয়ে থাকলেন কোনও অনির্দিষ্টের প্রতি। বললেন, ধ্রুবর সঙ্গে তখন দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। একদিন তুচ্ছ একটা কথায় খুব আলোড়িত হই। খুব রাগ হয়। সত্যিই ‘তুচ্ছ’ কথা, আজ মনে হয়। সেই রাগে কিঙ্করদার তৈরি মূর্তি টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে ফেলেছিলাম আমি। এমনভাবে ভেঙ্গেছিলাম যাতে আমার মুখের অবয়ব একটুও না বোঝা যায়।

বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন তিনি। অনেকক্ষণ পর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বললেন, আমার মূর্তি থাকল কী গেল, সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু রামকিঙ্করের তৈরি একটা শিল্পকর্ম নষ্ট করেছি। এটা অপরাধ। এই অপরাধ থেকে সারা জীবন আমি নিষ্কৃতি পাব না।

ফের চোখে জল এল। বললেন, আমি কিঙ্করদাকে পরে বলেছিলাম আমার এই অপরাধের কথা। সরিও বলেছি।

একবার তাঁকে ফোন করে বললাম, আপনার ‘সেই মেয়ে’ গানটা বহুদিন শুনিনি। আপনার কাছে নিশ্চয়ই রেকর্ডটা আছে। একদিন শোনবেন?
বললেন, তখন আমি গানটা ভাল গাইতে পারিনি। একদিন বাড়িতে এসো, আমি গেয়ে শোনাব।

তর সইছিল না। পরের দিনই হাজির হই বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’ যেমন তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয়, তেমনই সলিল চৌধুরির কথায় ও সুরে তাঁর কণ্ঠে ‘সেই মেয়ে’ও প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল এক সময়। রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলিকেই যেন নতুন সময়ে নিয়ে এসেছিলেন সলিল চৌধুরি ‘সেই মেয়ে’ গানে, যে-মেয়ের অনুভবে বিদ্রোহ আছে, প্রতিবাদ আছে।

১৯৫০ সালে ২৬ বছর বয়সে সেই গান গেয়েছিলেন সুচিত্রা মিত্র। আর আমি তার পঞ্চাশ বছর পরে, ৭৬ বছরের সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে সেই গান শোনার সৌভাগ্য নিয়ে হাজির।
বললেন, তখন আমার কণ্ঠ ভাল ছিল। এখন বুড়ো হয়েছি। কিন্তু গান তো শুধু গলা দিয়ে হয় না। কথা বলতে বলতে, একটু থেমে, সুচিত্রা মিত্র শুরু করলেন ‘সেই মেয়ে’।

আলের ধারে দাঁড়িয়ে-থাকা একা কৃষ্ণকলি তখন এই শহরে, আজকের মেয়ে হয়ে দাঁড়িয়ে। এ মেয়ের চোখে যে জল, তা ব্যক্তিগত শোকের নয়। এ মেয়ের গান অন্যের সন্তাপ মুছে দেওয়ার সুরে মগ্ন। এ মেয়ে একা এবং অনেকজন। এ মেয়ের বুকে আগুন আছে।
গান যখন শেষ হল, আমার সামনে সুর হয়ে, গান হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সুচিত্রা মিত্র। আমার দু’ফোঁটা অশ্রু আমি ছুঁইয়ে দিয়েছি সেই মেয়ের পায়ে।

মাসুদ করিম

লেখক। যদিও তার মৃত্যু হয়েছে। পাঠক। যেহেতু সে পুনর্জন্ম ঘটাতে পারে। সমালোচক। কারণ জীবন ধারন তাই করে তোলে আমাদের। আমার টুইট অনুসরণ করুন, আমার টুইট আমাকে বুঝতে অবদান রাখে। নিচের আইকনগুলো দিতে পারে আমার সাথে যোগাযোগের, আমাকে পাঠের ও আমাকে অনুসরণের একগুচ্ছ মাধ্যম।

৬ comments

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.