হেনরি মিলারের 'ভাবনাগুচ্ছ': ১২

উচ্চাকাঙ্ক্ষা আপনাকে গিলে খায়, একেবারে জ্যান্ত খেয়ে ফেলে। অল্পস্বল্প উচ্চাকাঙ্ক্ষায় অবশ্য অনেকদূর যাওয়া যায়।[...]

উচ্চাকাঙ্ক্ষা

উচ্চাকাঙ্ক্ষা আপনাকে গিলে খায়, একেবারে জ্যান্ত খেয়ে ফেলে। অল্পস্বল্প উচ্চাকাঙ্ক্ষায় অবশ্য অনেকদূর যাওয়া যায়। জীবনের লড়াইয়ে শুধু একটি বিষয়ে গোঁ ধরে রাখলে চলে না, চলার পথে এতে নানাভাবে ছাড় দিতে হয়। অসাধ্য সাধন করা আমাদের কাজ নয়, যেটা আমরা সবচেয়ে ভালো পারি সেটুকু করে গেলেই হলো।

আমি উচ্চাকাঙ্ক্ষার দানব ও সাফল্যের সংগ্রাম দ্বারা তাড়িত ছিলাম। ঘোরতর নাস্তিক হওয়া স্বত্বেও আমি হাঁটু গেড়ে বসে করজোড়ে প্রার্থনা করতাম “হে ঈশ্বর আমাকে লেখক বানিয়ে দাও, যেনতেন কোন লেখক নয়, একজন বড় লেখক।” আমি লিখতে শুরু করার আগে থেকেই আমার সাহিত্যিক সক্ষমতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ ছিলাম। অন্তত আমার নিজের বিবেচনায় আমি তখনই বিখ্যাত সব লেখকদের সমকক্ষ ছিলাম। যখন কেউ জিজ্ঞাসা করতেন আমি কী লিখেছি তখন আমি কল্পনা থেকে একগাদা বানানো গল্পের শিরোনাম বলে যেতাম এবং সেগুলো জনপ্রিয় সব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করতাম। আমি জন্মাবধিই ছিলাম বানিয়ে বলায় ওস্তাদ।

এতসব কিছুর ভিতর দিয়েই আমি বিনয়ে ছাই ও ধুলোর সমান হতে পারার মূল্য শিখেছিলাম। সবারই সেই অভিজ্ঞতা হওয়া উচিৎ। নিজেকে কেউ একজন বলে স্বীকৃতি দেবার আগে আপনাকে জানতে হবে যে আপনি কেউ নন।

প্রজাপতির জন্ম জীববিদ্যার জগতে একটি অন্যতম রহস্যময় ও বিস্ময়ের বিষয়। ‘ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির জন্ম’ কিংবা ‘অশুভ থেকে শুভ-র উদয়’ জাতীয় আপ্তবাক্যের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে তা। শুরুতে প্রজাপতি থাকে খুবই দীনহীন অবস্থায়। সেই গুটিপোকা প্রতি মুহূর্তে পাখা মেলে উড়াল দেবার স্বপ্নে বিভোর থাকে না। সে একটা কার্যকর ও উপকারী পোকার জীবন যাপন করে। এবং তাকে পোকা হিসাবেই মৃত্যুবরণ করতে হয়, পরীরূপে জন্ম নেওয়ার জন্য।

গুটিপোকার সুতোবোনা নিজেই একটি অবিশ্বাস্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেটি প্রজাপতির উদ্ভব ও প্রথম উড্ডয়নের মতই সমান বিস্ময়জাগানিয়া।

ভক্তবৃন্দ

ভক্তেরা চুলের খুসকির মত, অনেকটা গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া গোছের। অবশ্য ভক্তদের মধ্য থেকে আমি দুয়েকজন ভাল বন্ধুও পেয়েছি, যদিও তাদের সংখ্যা আঙুলে গোণা যায়।

তারা একসময় পঙ্গপালের মত ভিড় করে আসত। আমি যখন বিগ সুর-এ থাকতাম তখন প্রায় প্রতিদিনই সকালে উঠে দেখতাম কেউ না কেউ গাছের ডালে কিংবা বেড়ার ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে আমাকে দেখার আশায়। তাদের মধ্যে কখনো কখনো পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে আসা বদ্ধ উন্মাদ যেমন থাকত, তেমনি আবার থাকত সেনাদলবিতাড়িত দলছুট মানুষেরা। তারা আমার কাছে আসত কারণ তারা বিশ্বাস করত আমিই তাদের প্রকৃত মুখপাত্র। আমি তাদের সঙ্গে এত সময় কাটিয়েছি যে মাঝেমধ্যে মনে হত আমিও বুঝি পাগল হয়ে যাব। হা ঈশ্বর! আমি চাইলে তো বাকি জীবন করমর্দন আর স্বাক্ষর বিতরণ করেই কাটিয়ে দিতে পারতাম।

তারপর আছে চিঠির উৎপাত। সম্ভাব্য সব ধরণের মানুষই আমাকে চিঠি লিখেছে: প্রশংসা, নিন্দা, অনুরোধ, আব্দার এমনকি বিবাহপ্রস্তাব মিলিয়ে আমি যত চিঠি পেয়েছি সেটি রীতিমত বিস্ময়কর! গড়ে আমি যে ধরণের চিঠি পেতাম তার নমুনা অনেকটা এরকম: “প্রিয় হেনরি, আমি এক বউ ও তিন বাচ্চাঅলা একজন অভাবী লেখক। আমি আপনার সবগুলো বই পড়ে এতটুকু বুঝতে পেরেছি যে একমাত্র পারী-তে গিয়ে কয়েকবছর কাটিয়ে আসতে পারলেই আমি কিছু একটা হতে পারব। আপনি যদি আমাকে কয়েক হাজার ডলার অথবা আমার সংসার চালিয়ে নেবার মত যথেষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠান…..”, ভাবুন আপনারা!

আমি আপনাদের বলি, আজকালকার তরুণদের জীবনে লড়াইটাই নাই। তারা যদি ভাবে যে আমি তাদের পরিবারের ভরণপোষণ করব আর তারা মহাশিল্প রচনা করবে, তাহলে আমি বলব যে তারা আমার কাজ ও জীবনটাকে অনুধাবনই করতে পারে নি। লেখক কিংবা শিল্পী হতে চাইলে অভুক্ত থাকার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হয়।

সংগ্রাম হচ্ছে সমস্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে অমূল্য। স্পর্শকাতর, সৃজনশীল মানুষদের জন্য যন্ত্রণাবোধ অপরিহার্য। দারিদ্র্য, ব্যাধি, মৃত্যু, ব্যর্থ প্রণয়, যাবতীয় আশাভঙ্গের বেদনাই হচ্ছে শিল্পসৃষ্টির মূল ইন্ধন।

বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলেদের দ্বারা কোনদিন বড় শিল্পের সৃষ্টি হয় নি। অধিকাংশ সময়ই এর জন্ম হয় এক ধরণের অভাব ও অতৃপ্তিবোধ থেকে, আর তা যদি না হয় তাহলে স্রেফ কঠিন পরিশ্রমের ফসল হিসাবে। এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে লেখকশিল্পীরা শিখে নেন কী করে দুঃখ, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার যন্ত্রণাকে উদযাপন করতে হয়, কীভাবে সকল হতাশা ও অপ্রাপ্তিকে বিশাল ও ইতিবাচক কিছুতে- যেমন অসাধারণ কোন গ্রন্থ, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা কিংবা নৃত্যকর্মে- রূপান্তরিত করতে হয়।

সেন্সরশিপ

লেখক হিসাবে আমার প্রথম প্রশংসা জোটে ফ্রান্সের কাছ থেকে। আমি সেই দেশে খুব সুখে পাক্কা দশ বছর বাস করেছি এবং এর প্রায় সবকিছুকেই ভালোবেসেছি, এর মানুষ, রীতিনীতি, ভাষা- সবকিছুই। মজার ব্যাপার হল, দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির পর অবকাশযাপনের জন্য ফ্রান্সে ফিরে আসার পথে আমার বই সেক্সাস-এর কিছু অংশের কারণে আমাকে শ্রীঘরে যেতে হচ্ছিল প্রায়। জনশালীনতায় আঘাত করার অপরাধে আমাকে আদালতে হাজিরা দিতে বলা হল ।

আদালতে প্রাথমিক শুনানিতে শুধু আমরা তিনজন ছিলাম- আমি, আমার উকিল আর বিচারক মহাশয়। আমার মামলাটি উচ্চ আদালতে পাঠানো হবে কি না এই শুনানিতেই সেটা নির্ধারিত হওয়ার কথা ছিল।

শুনানি শুরু হবার আগে, আদালতকক্ষের দরজার মুখে আমি খুব নার্ভাসভাবে সামনেপেছনে পায়চারি করছিলাম। ঘনঘন পেচ্ছাপখানায় যাওয়া থেকে আমি কিছুতেই নিজেকে বিরত রাখতে পারছিলাম না। এমনকি বিচারকের সামনে বসে তার জেরার জবাব দিতে দিতেও এক পর্যায়ে আমি তাকে আমার জলত্যাগের প্রয়োজনীয়তার কথা বললে, তিনি শুনানি চলাকালে বাইরে যাবার ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা জানান। তিনি আরও বলেন “আপনাকে পাৎলুনের মধ্যেই এটা সেরে নিতে হবে, কোন অসুবিধা নাই।” আমি আর কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না, অগত্যা তার পরামর্শ শিরোধার্য করে ঠিক তাইই করতে হল। ব্যাপারটি খুব বিব্রতকর ছিল সন্দেহ নেই কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। বিচারক মহাশয় তার জেরা চালিয়ে যাচ্ছিলেন যেন কিছুই ঘটে নি। তিনি ছিলেন সেইসব অপূর্ব ফরাসিদের একজন- আত্মমর্যাবান, দরদি এবং বুদ্ধিমান।

আমি খুব সৌভাগ্যবান ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে আমি জেলে যেতে পারতাম। কিন্তু বিচারক আমার লেখা পড়েছিলেন, তিনি আমার জীবন ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। আমি প্রায় চমকে উঠেছিলাম যখন তিনি আমাকে ‘দায়মুক্ত’ বলে রায় দিলেন। এমন কোন রায়-এর আদৌ অস্তিত্ব থাকতে পারে সেটাই আমার কল্পনার বাইরে ছিল।

রায় ঘোষণা করে তিনি এজলাস ছেড়ে নিচে নেমে আমার কাছে এসে দুই গালে চুমু খেয়ে গভীর শ্রদ্ধাভরে বললেন “মশাই আপনি আরেকজন রাঁবো, বোদল্যের, রাবেলে, জোলা! আপনি আমাদেরই একজন।”

সে রাতে আমি হাঁটু গেড়ে বসে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই আমাকে এমন একজন সুরুচিসম্পন্ন বিচারকের মুখোমুখি হবার সুযোগ দেওয়ার জন্য। এই ঘটনা যদি অন্য কোথায় ঘটত তাহলে আমাকে নির্ঘাৎ জেলের ঘানি ঠেলতে হত।

আলম খোরশেদ

লেখক, অনুবাদক, সংস্কৃতিকর্মী

২ comments

Have your say

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.